সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৯

বিলুপ্তির পথে দেশের এক চতুর্থাংশ উদ্ভিদ ও প্রাণী

পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হুমকির মুখে দেশের জীববৈচিত্র্য। দেশের ১০৬ প্রজাতির উদ্ভিদ এবং ১৩৭ প্রজাতির প্রাণী নানা পর্যায়ে বিপন্ন। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন এসব তথ্য জানিয়েছে।

তাদের তথ্য মতে, বিলুপ্ত হয়ে গেছে মেরুদণ্ডী প্রাণীর ১০ প্রজাতি। আগামীতে এই সংখ্যা আরো দীর্ঘ হবে। তাদের আশঙ্কা, আগামী দুই দশকে দেশের ২৫ শতাংশ প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী বিলুপ্ত বা বিপন্ন হয়ে যাবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত কয়েক বছর ধরেই ক্রমাগত পরিবেশ প্রাণীকূলের বিপক্ষে চলে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে ওজোন স্তরের ক্ষয়, কার্বন নির্গমনের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বাতাসে সীসার পরিমাণ বৃদ্ধি প্রভৃতি কারণে পরিবেশ ক্রমেই বিপন্ন হচ্ছে। এমনকি অতি সম্প্রতি বয়ে যাওয়া দাবদাহের মতো ঘটনাগুলোও পরিবেশে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। এসব কারণে বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের জীববৈচিত্র্যই হুমকির মুখে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আগামী ২০ থেকে ৩০ বছরের ব্যবধানে এসব অঞ্চল থেকে অনেক প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। যেসব প্রজাতি এই পরিবেশের জন্য অবশ্যই প্রয়োজনীয়।

পরিবেশ ও পরিবেশের বিপর্যয় নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড লাইফ ট্রাস্ট অব বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী আনোয়ারুল ইসলাম রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘জেনে বা না জেনে হোক আমাদের কর্মকাণ্ডের কারণেই পরিবেশ প্রতিকূল হচ্ছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে প্রাণীকূলের ওপর। অতীতের তুলনায় বর্তমানে বিভিন্ন প্রজাতির বিলুপ্তির হার অনেকগুণ বেশি। জীববৈচিত্র্যের এত প্রতিকূল পরিবেশ অতীতে কখনো সৃষ্টি হয়নি। এমনকি পরিবেশের বিষয়ে উদাসীনতা থেকে আন্দাজ করা যায় এই প্রতিকূলতা আগামীতে আরো বাড়বে। কমার কোনো সম্ভাবনাই আমরা দেখছি না।’

এই পরিবেশবিদ আরো বলেন, ‘এখনই পরিবেশ বিভিন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণীর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। যে কারণে এসব বিপন্ন হচ্ছে। কিন্তু খুব সত্যি যে, এই ধারা চলতে থাকলে পৃথিবী মানুষের জন্যই প্রতিকূল হয়ে যাবে।’

বেসরকারি সংস্থা ওয়াইল্ড লাইফ ট্রাস্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০১৩ সালের শেষ দিকে সংস্থাটি বিপন্ন বিভিন্ন প্রজাতি নিয়ে একটি গবেষণা চালায়। ওই গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য মতে, দেশের প্রায় ৯০০ প্রজাতির বন্যপ্রাণীর মধ্যে দেড়শ’ প্রজাতিই বিলুপ্তির পথে। স্তন্যপায়ী, পাখি, উভচর ও সরীসৃপ প্রজাতির এসব বন্যপ্রাণীর বেশিরভাগ অতি বিপন্ন ও ক্ষতিগ্রস্তের তালিকায়।

সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, জনসংখ্যার চাপ, ব্যাপক হারে বন উজাড়, বন্যপ্রাণী শিকার, নদীর নাব্য হ্রাস ও ভারসাম্যহীন পরিবেশ জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী বিপন্নতার অন্যতম কারণ। ২০১৩ সালের পর পরিবেশের অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে। সেক্ষেত্রে বিপন্ন প্রজাতির সংখ্যা আরো যোগ হতে পারে।

পরিবেশ ও বিভিন্ন প্রাণী নিয়ে কাজ করা কয়েকটি সংস্থার তথ্য মতে, বাংলাদেশের প্রায় ৯০৩ প্রজাতির বন্যপ্রাণীর মধ্যে ৩০-৩৫টি উভচর, ১২৬টি সরীসৃপ, ৬৫০টি পাখি এবং ১১৩টি স্তন্যপায়ী প্রজাতি রয়েছে। পৃথিবীতে শনাক্ত করা জীব প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত শনাক্ত করা উদ্ভিদের সংখ্যা ৬ হাজার ৬৩৪ এবং প্রাণী প্রজাতির সংখ্যা ৫ হাজার ৩৫১টি।

এ ধরনের কয়েকটি সংস্থার তথ্য একত্র করে পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বাংলাদেশ থেকে ইতোমধ্যে বেশকিছু স্তন্যপায়ী প্রজাতি বিলুপপ্ত হয়ে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে গণ্ডারের ৩টি প্রজাতি, বনগরুর ২টি প্রজাতি, নেকড়ে, হরিণের ২টি প্রজাতি, বনমহিষ, নীলগাই, দুই প্রজাতির পাখি এবং এক প্রজাতির সরীসৃপ।

এ ছাড়া বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে ৪৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৪৭ প্রজাতির পাখি, ৮ প্রজাতির উভচর, ৬৩ প্রজাতির সরীসৃপ।

বিপন্ন অবস্থায় থাকা অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে রয়েছে লাজুক বানর, পারাইল্লা বানর, কুলু বানর, উল্লুক, রামকুত্তা, গেছোবাঘ, চিতা বাঘ, উদ্বিড়াল, ভাল্লুক, শুশুক, বনছাগল, মুখপোড়া হনুমান, বনবিড়াল, মেছোবাঘ, কাঁকড়াভুক বেজি, ভোঁদড়, কালো ভাল্লুক, বাগডাস, মায়াহরিণ।

বিলুপ্ত হয়ে পড়েছে লালসির হাঁস ও ময়ূর। অতি বিপন্ন পাখির তালিকায় রয়েছে কালো তিতির, কাঠময়ূর, বাদিহাঁস, বাঞ্জাহাঁস, রাজধনেশ, পাহাড়ি ঘুঘু, হরিয়াল, কোরাল, লালসির শকুন, হাড়গিলা, পাহাড়ি ময়না, মথুরা, কাওধনেশ, ঈগল, পেঁচা, হটটিটি প্রভৃতি।

এ ছাড়া উভচর প্রজাতির পটকা, সবুজ ও গেছো ব্যাঙ এখন বিপন্ন প্রাণীর তালিকায়। সরীসৃপ প্রজাতিতে বিলুপ্ত হয়েছে মিঠাপানির কুমির। শুধু চিড়িয়াখানা ও খানজাহান আলীর মাজার ছাড়া এদের এখন আর কোথাও দেখা যায় না। লবণাক্ত পানির কুমির ও মেছো কুমির অতি বিপন্ন অবস্থায় টিকে আছে। কচ্ছপ প্রজাতির মধ্যে বড় কাইটা, কাছিম, হলুদ পাহাড়ি কাছিম অতি বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে। সাপের মধ্যে নির্বিষ গুলবাহার অজগর, বিষধর সাপ চন্দ্রবোড়া অতি বিপন্ন এবং কালকেউটে গোখরা, ভাইপার, কালনাগিনী, দুধরাজ, সবুজ ডোরা প্রভৃতি বিপন্ন সাপের তালিকায়।

এ ছাড়া নথিপত্রের বাইরেও বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, খাবারের সন্ধানে লাউয়াছড়া বনাঞ্চলসহ সদর, বড়লেখা ও জুড়ী উপজেলায় বনাঞ্চল থেকে এখন হরহামেশাই মেছো বাঘ, মায়া হরিণ, বনমোরগ, বানর, সাপ লোকালয়ে বেরিয়ে আসছে। এর মধ্যে অনেক প্রাণী মারা পড়ছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন, ভারসাম্যহীন পরিবেশ ও বন্য পশুপাখির অভয়ারণ্য নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে দেশের বনাঞ্চল থেকে জীববৈচিত্র্য ও প্রাণী বৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়ছে।

তিনি বলেন, এই অবস্থার উত্তরণ না হলে আগামীতে বিলুপ্তির খতিয়ান দীর্ঘতর হবে। বিলুপ্ত, বিপন্ন ও নতুন প্রজাতির সংখ্যা বাড়বে। তবে, বাংলাদেশেও প্রজাতির বিপন্নতা ও বিলুপ্তির কারণ শুধুমাত্র প্রাকৃতিক নয়, মানুষের কর্মকাণ্ডেরও ফল। আমাদের আরো বেশি পরিবেশবাদী হওয়া উচিত।

তবে পরিবেশবিদদের সঙ্গে আলাপে কিছু আশার কথাও জানা গেছে। তারা বলছেন, এত প্রতিকূলতার মধ্যেও যেসব প্রজাতি এখান থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে সেসব প্রজাতির কোনোটি আশপাশে টিকে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ জীব প্রজাতির বিচরণ ক্ষেত্র একটি নির্দিষ্ট দেশের সীমানার মধ্যে অবস্থান করে না। তাই আমাদের পরিবেশ আগের মতো হলে তারা ফিরেও আসতে পারে। এ ছাড়া বিলুপ্তির পাশাপাশি অনেক নতুন প্রজাতিও জন্ম নিচ্ছে।

এক হিসাবে দেখা গেছে, বিগত ৫ বছরে আমাজান বনাঞ্চলে আবিষ্কৃত হয়েছে ৩০০ নতুন প্রজাতির মাছ এবং ৪ প্রজাতির নতুন বানর জাতীয় প্রাণী। তাই এখনই পরিবেশ রক্ষায় পদক্ষেপ নিলে আমরা ফিরে পেতে পারি আমাদের হারানো বিভিন্ন প্রজাতি।

এদিকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব পরিবেশ দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, ‘প্রাণের স্পন্দনে, প্রকৃতির বন্ধনে’ এবং দিবসটি উপলক্ষে এবারের স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে ‘আমি প্রকৃতির, প্রকৃতি আমার’।

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখক সম্পর্কে জানুন

এই রকম আরও সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *