সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৯

ঈদে চাহিদার শীর্ষে সিল্কের পোশাক, সাথে বাহুবলি

পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর অনুষ্ঠিত হতে আর মাত্র দিন নয় বাকি। কাপড়ের দোকানগুলোতে কেনাকাটার ধুম পড়েছে। ঈদ আনন্দকে রঙ্গিন করে তোলার জন্য সাধ্যমত পছন্দনীয় পোশাক কেনার চেষ্টা করছেন নানা শ্রেনী পেশার মানুষ। তবে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেনীর ক্রেতারা বাহারি ধরনের পরিধান কেনার সাথে সাথে সিল্ক কাপড়ের কোন কিছু কেনারও চেষ্টা করছেন। সেই ধারাবাহিকতায় বরাবরের মতই এবারো সিল্ক কাপড়ের শো-রুমগুলোতে ভিড় বাড়ছে ক্রেতাদের।

সময়ের ধারাবাহিকতায় রাজশাহীর এই ঐতিহ্যবাহি এই কাপড়ের চাহিদাও বেড়েছে। রাজশাহীসহ আশে পাশের জেলার ক্রেতারা ভিড় করছেন বহি:সজ্জা কেনার জন্য বলে দাবি বিক্রেতাদের। আর চাহিদা বেড়ে যাবার কারনে রাতদিন কাজ করে সিল্কপল্লীর কারিগররা নিপুন হাতে শাড়ি, থ্রি-পিস, পাঞ্জাবিসহ নানা ধরনের পোশাক তৈরি করে তুলছেন শো-রুমগুলোতে।

মুসলিমদের ধর্মীয় উৎসব আসলেই নানান ধরনের কাপড় কেনার ধুম পড়ে। নতুন জামা কাপড় পরেঈদগাহে যাওয়া থেকে শুরু করে ঘরে বেড়ানোর আনন্দকে কোনভাবেই ম্লান হবার সুযোগ দিতে চান না। এই উৎসবকে ঘিরে সকল পোশাক বিপনীতে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। সিল্কের দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় চোখে পড়ার মতই।সিল্কের পাঞ্জাবি, থ্রি-পিস, হিজাব, ওড়না, স্কার্ফ এবং মসলিন, মটকা, তসর কাতান, বলাকা কাতান, সাটিং সিল্ক ও এনডি প্রিন্টের শাড়ি থরে থরে সাজানো রয়েছে শো-রুমগুলোতে। বাচ্চাদের সিল্কের বাহুবালি-২ এবং বড়দের শার্ট, পাঞ্জাবি ও ফতুয়াসহ সিল্কের নানা পোশাক।শার্ট এক হাজার থেকে আড়াই হাজার, পাঞ্জাবি এক থেকে পাঁচ হাজার এবং স্কার্ফ, ওড়না ও হিজাব বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকায়। এছাড়া মসলিন সিল্কের ওপর হাতের কারুকাজ করা শাড়ি বিক্রি হচ্ছে ছয় হাজার থেকে ১০ হাজার টাকায়। বলাকার শাড়ি ৭ হাজার ৮০০ থেকে সাড়ে ১৪ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এসব নতুন পোশাকের পাশাপাশি এমব্রয়ডারি, মসলিন শিপন, জামদানি, ধুপিয়ান, র-কাতান, জয়শ্রী, স্বর্ণ কাতান, মসলিন ব্রাশো, ঝলক কাতানসহ বাহারি রং আর মনকাড়া ডিজাইনের সিল্ক কাপড়ে ঠাসা রয়েছে তাদের শো-রুম।

রাজশাহী মহানগরীর বিসিক সিল্কপল্লীতেদেখা গেছে, কারিগররা সবাই ব্যস্ত কাজে। নারী কর্মীদের মধ্যেকেউ সুঁই সুতোর ফোঁড়নে কাপড়ে আঁকছেন বাহারি নকশা। কেউ করছেন রংয়ের কাজ। আবার কেউ কাপড়ে চুমকি ও পুঁথি বসানোর কাজও করছেন। কেউ চালাচ্ছেন তাঁত। এবার ঈদে সিল্কপল্লীতে ৪০ থেকে ৪৫ কোটি টাকার বাণিজ্যের আশা করছেন কারখানা মালিকেরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক সময় রাজশাহীতে ৭৬টি সিল্ক কারখানা ছিল। এখন বন্ধ হয়ে নেমেছে মাত্র ৬টিতে। স্থানীয়ভাবে ৪০ শতাংশ সুতার চাহিদা মেটে ব্যবসায়ীদের। বাকি ৬০ ভাগ সুতা আমদানি করতে হয় ভারত ও চীন থেকে। এমন প্রতিকূলতার মাঝে রেশম নগরীর নাম টিকিয়ে রেখেছেন ওই ৬টি কারখানা। আর কারখানাগুলোতেই গড়ে উঠেছে ১৩টি শো-রুম। কারখানা ও শো-রুমগুলোতে এখনও পুরুষের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক নারী শ্রমিক কাজ করছেন।

ব্যবসায়ীরা জানান, সপুরার পুরো সিল্কপল্লীর ঐতিহ্যবাহী কাপড়ের কদর রয়েছে সারাবছরই। বাঙ্গালির বিভিন্ন উৎসবে সেই কদর আরো কয়েক গুণ বেড়ে যায়। হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সব শ্রেণির মানুষের উৎসবেই এক অন্যরকম আমেজ আনে রাজশাহীর সিল্কের পোশাক। ফলে এবার ঈদকে ঘিরেও সিল্কের বাজার জমে উঠেছে।

আমেনা সিল্কের শো-রুমে পছন্দের কাপড় কিনতে পাবনা থেকে আসা ফাতেমা বেগম নামে এক ক্রেতা জানান, প্রতি ঈদের আগেই তিনি রাজশাহীতে বেড়াতে এসে সিল্ক কাপড় কিনে নিয়ে যান। তাই এবারও এসেছেন। নিজের ও শাশুড়ির জন্য একটা করে শাড়ি এবং স্বামীর জন্য একটা পাঞ্জাবিসহ আরো কিছু কেনেন তিনি। তার কাছে দামও মনে হয়েছে সহনশীল। পাঞ্জাবি ক্রেতা জুয়েল বলেন, ‘দেশের ঐতিহ্যবাহী এই কাপড় শুধু ঈদে নয়, সারা বছরই মানুষের মন কাড়ে। তবে উৎসবে এর কোনো জুড়ি নেই।’

উষা সিল্কের শো-রুমে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে সিল্কের পাঞ্জাবিতেও এবার এসেছে নতুনত্ব। এনডি ও বলাকা সিল্ক কাপড়ের ওপরে কাজ করা পাঞ্জাবি বিক্রি হচ্ছে বেশি। মেয়েদের থ্রি-পিসেও এসেছে বাহারি রং ও ডিজাইন।

সপুরা সিল্কের বিপণন ব্যবস্থাপক সাইদুর রহমান জানালেন, বরাবরের মতই ঈদে ক্রেতাদের চাহিদার শীর্ষে রয়েছে সিল্কের পোশাক। তাই কারখানায় রাতদিন কাজ চলছে সমানতালে। রোজার প্রথম সপ্তাহের দিক থেকেই ক্রেতারা ভিড় করছেন। শুধু রাজশাহীসহ অন্যান্য জেলার ক্রেতারা আসছেন পছন্দের কাপড় কিনতে। ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের পাইকারী ক্রেতারাও কিনে নিয়ে যাচ্ছেন ঈদের নতুন সিল্ক পোশাক।এবার ঈদ উপলক্ষে তারা বেশকিছু নতুন ডিজাইনের পোশাক তৈরি করেছেন। এর মধ্যে বলাকা সিল্কের থ্রি-পিস পাওয়া যাচ্ছে আড়াই হাজার থেকে সাড়ে ৮ হাজার টাকায়। মসলিনের থ্রি-পিসের দাম সাড়ে চার হাজার থেকে সাত হাজার ৮০০ টাকা। সিল্কের শার্ট বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৩০০ থেতে এক হাজার ৬০০ টাকায়। আর পাঞ্জাবির দাম তিন থেকে ছয় হাজার টাকা।

আমেনা সিল্কের বিপণন ব্যবস্থাপক সেলিম হোসেন জানান, গত বছরের তুলনায় এবার রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী সিল্ক কাপড়ের দাম তেমন বাড়েনি। গত বছর সিল্কের যে শাড়ির দাম ছিল ৩ হাজার টাকা, এবার তা বেড়ে হয়েছে সাড়ে ৩ হাজার। কিন্তু বাজারে অন্যান্য শাড়ির দাম বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। এই শো-রুমে মেয়েদের ওয়ান পিস ও কটন সিল্কের ফতুয়া বিক্রি হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।

রাজশাহী সিল্ক ফ্যাশনের স্বত্বাধিকারী আবদুল কাদের মোল্লা বলেন, ভারত ও চীন থেকে সিল্কের কাপড় আমদানির কারণে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এছাড়া এখন অনলাইনে নকল সিল্কের কাপড়ের ছড়াছড়ি। দেশের একটি প্রতারকচক্র রাজশাহীর সিল্ক নামে অনলাইনে নকল সিল্কের কাপড় বিক্রি করছেন। এতে ক্রেতারা প্রতারিত হচ্ছেন। রাজশাহীর সিল্কেরও সুনাম ক্ষুন্ন হচ্ছে। এটি বন্ধে প্রশাসনের কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ রেশম শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি লিয়াকত আলী বলেন, যেসব কারখানা চালু রয়েছে, সীমাবদ্ধতার মাঝেও তারা ক্রেতার মন জয় করতে চেষ্টা করছেন। তাই রাজশাহীর সিল্কের ঐতিহ্য ধরে রাখতে সরকারের বিশেষ সহায়তা ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখক সম্পর্কে জানুন

এই রকম আরও সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *