অক্টোবর ২২, ২০১৯

কতো স্বাদের নানা মিষ্টি

ডেক্সঃ
যদি মিষ্টি খেতে মিষ্টি না হয়ে অন্য কোনো স্বাদের হতো, সে ক্ষেত্রে মিষ্টির নাম হতো কী? মিষ্টি একাধারে যেমন একটি স্বাদের নাম, ঠিক তেমনি মিষ্টি একটি বিশেষ মিষ্টান্ন জাতীয় খাদ্য প্রকার। চায়ে চিনি দিলে বলা হয় মিষ্টি চা। চিনি দিয়ে তৈরি বিস্কুটকে বলা হয় মিষ্টি বিস্কুট। শরবতে লবণের পরিবর্তে চিনি দিলে বলা হয় মিষ্টি শরবত। তাই যদি হয়, তাহলে মিষ্টিতে চিনি দিলে সেটাকে কী বলা হবে? মিষ্টি চিনি? আচ্ছা ঠিক আছে, মিষ্টি নিয়ে যতসব মিষ্টি মিষ্টি কথা না বাড়িয়ে চলো শুনি কিছু মিষ্টি কাহিনী।

মিষ্টি কী

মিষ্টি হলো চিনি বা গুড়ের রসে ভেজানো ময়দার গোলা কিংবা দুধ-চিনি মিশিয়ে তৈরি বিভিন্ন আকৃতির ছানার-ময়দার টুকরো করা খাবার। আমাদের খাওয়া-দাওয়ায় মিষ্টি একটি অতি জনপ্রিয় উপকরণ। কোনো উপলক্ষ-অনুষ্ঠানই মিষ্টি ছাড়া যেন পূর্ণতা পায় না। মিষ্টির নাম শুনলেই জিভে পানি আসে। বাংলাদেশে মিষ্টিকে পণ্য করে গড়ে উঠেছে অগণিত নামীদামি মিষ্টি বিক্রয়কেন্দ্র। সেই প্রাচীন যুগের লাড্ডু থেকে শুরু করে সন্দেশ, কালোজাম পেরিয়ে আজ মিষ্টির প্রকারভেদ শিল্পের পর্যায়ে চলে গেছে। বিভিন্ন রকমের মিষ্টি স্বাদ, আকারে এমনকি নামকরণে ভিন্নতা নিয়ে জনপ্রিয়।

মিষ্টির প্রকারভেদ
বাংলার মিষ্টিকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম ভাগে আছে একক উপাদানে তৈরি মিষ্টি। এ ধরনের মিষ্টিতে গুড় বা চিনির সাথে আর কিছু মিশ্রিত থাকে না। যেমন গুড় বা চিনির নাড়– ও চাকতি, পাটালি, বাতাসা, খাজা, ছাঁচ ইত্যাদি। দ্বিতীয় ধরনের মিষ্টিকে আরো দু’রকমে ভাগ করা চলে। গুড় বা চিনির সাথে দুগ্ধজাত কোনো উপকরণ ছাড়া অন্য দ্রব্য সহযোগে তৈরিকৃত মিষ্টান্ন। যেমন নারকেল, তিল এসবের নাড়–, চিঁড়া, মুড়ি, খৈ-এর মোয়া ইত্যাদি। দুগ্ধজাত দ্রব্যযোগে তৈরি নানান ধরনের মিষ্টি রসিক ও মিষ্টিপ্রিয় মানুষের সুপরিচিত। চিনির সাথে ছানার সংযোগে তৈরি হয় সন্দেশ ও মণ্ডা। আবার এই ছানা রসে মাখিয়ে তৈরি হয় রসগোল্লা, দুধে ডোবালে রসমালাই। বেসনের ছোট ছোট দানা ঘিয়ে ভেজে তৈরি হয় বুন্দিয়া, যা দেখতে ছোট বিন্দুর মতো। কড়া পাকে প্রস্তুতকৃত বুন্দিয়াই মতিচুর, লাড্ডুর কাঁচামাল।

ইতিহাস
ভারতবর্ষের সবচেয়ে প্রাচীন মিষ্টি মতিচুরের লাড্ডু। বয়স প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি। আধুনিক সন্দেশ-রসগোল্লার বয়স মাত্র দুই-আড়াই শ’ বছর। বাঙালিরা ছানা তৈরি করতে শিখেছে পর্তুগিজদের থেকে। তাদের কাছ থেকে বাঙালি ময়রারা ছানা ও পনির তৈরির কৌশল শেখে। উপমহাদেশে ছানা তৈরির শিক্ষাবিস্তার অনেক পরের ঘটনা।
সন্দেশ ছানা আবিষ্কারের আগে ছিল। আগের দিনে সন্দেশ তৈরি করা হতো বেসন, নারকেল ও মুগের ডালের সঙ্গে চিনির সংযোগে। এ ছাড়া শুধু চিনি দিয়ে তৈরি এক ধরনের চাকতিকেও অনেক সময় সন্দেশ বলা হতো। চিনির সঙ্গে ছানার রসায়নে আধুনিক সন্দেশ ও রসগোল্লার উদ্ভাবন অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে। এই আধুনিক সন্দেশ রসগোল্লার আবিষ্কর্তা হুগলির হালুইকররা। পরে তারা কলকতায় এসে বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে একে জগদ্বিখ্যাত করে তোলেন। প্রথম দিকে ছানার সন্দেশকে বলা হতো ‘ফিকে সন্দেশ’। কারণ, এ সন্দেশে আগের দিনের সন্দেশের চেয়ে মিষ্টি কম।
রসের রসিক বাংলাদেশীরা চিনির সিরায় ডোবানো বিশুদ্ধ ছানার গোল্লাকে নাম দিয়েছে রসগোল্লা। পরে ছানা ও চিনির রসায়নে নানা আকৃতি ও স্বাদে নানা নামে মিষ্টির সম্ভার হয়ে উঠেছে বৈচিত্র্যময়। এর মধ্যে আছে লেডিকেনি, চমচম, পানিতোয়া, কালোজাম, আমৃতি, রসমালাই। রসগোল্লার মতোই গোলাকার লাল রঙের লেডিকেনি নামে মিষ্টিটি তৈরি হয়েছিল ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেল লর্ড ক্যানিংয়ের স্ত্রীর সম্মানে। লোকমুখে এর চলতি নাম লেডিকেনি। ছানার মিষ্টি এপার-ওপার উভয় বাংলায় বিপুল জনপ্রিয় হলেও বঙ্গের বাইরে, বিশেষত ভারতের অন্যত্র এখনো ছানার মিষ্টি তেমন তৈরি হয় না। বহির্বঙ্গের মিষ্টি প্যাড়া, মেওয়ার শুকনো মিষ্টি।

মিষ্টি নির্মাতা
মিষ্টি নির্মাণ বা তৈরি একটি বিশেষ কলা। যারা মিষ্টি তৈরি করেন তাদের বলা হয় ময়রা। এলাকাভিত্তিক মিষ্টির প্রসিদ্ধি ছাড়াও ব্যক্তিগতভাবে অনেক মিষ্টিশিল্পী খ্যাতিমান হয়েছেন বিশেষ কোনো মিষ্টি তৈরির জন্য।
বাংলাদেশের বিখ্যাত মিষ্টি
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ বিশেষ মিষ্টির ক্ষেত্রে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেছেন সেখানকার ময়রারা। তাঁদের নিষ্ঠা ও সৃজনশীলতায় ঐতিহ্যবাহী হয়ে উঠেছে সেসব মিষ্টি। আমরা এখন সেসবেরই কয়েকটি সম্পর্কে জানব।
বগুড়ার দই : বগুড়া জেলার প্রায় ১০০ দোকানে প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকার দই বেচাকেনা হয়। সে হিসাবে বছরে বিক্রি ১০০ কোটি টাকা। বগুড়াকে দইয়ের শহর বলা হলেও শুরুটা হয়েছিল শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে শেরপুরে। গত শতাব্দীর ষাটের দশকে এ দইয়ের নাম ছিল নবাববাড়ীর দই। স্বাধীনতার পর শহরের মহরম আলী ও বাঘোপাড়ার রফাত আলীর নাম ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় ছোট ছোট মাটির পাত্রে (স্থানীয় ভাষায় হাঁড়ি) দই ভরানো হতো। ঘোষদের ছোট ছোট দোকান থাকলেও ওই সময় ফেরি করেই দই বেশি বিক্রি হতো। পরে বগুড়ার দইঘরের মালিক আহসানুল কবির দই তৈরি ও বাজারজাতকরণে নতুনত্ব নিয়ে আসেন। ওজন দিয়ে এই দই বিক্রি হয় না। বিক্রি হয় পিস হিসেবে।
সাদেক গোল্লা : জামতলার রসগোল্লা যশোরের যশ বাড়িয়ে দিয়েছে। স্থানীয়রা একে বলে সাদেক গোল্লা। যশোর থেকে সাতক্ষীরার বাসে ৩৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিলেই জামতলা বাজার। বাজারের বটতলায় সাদেক মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। ১৯৫৫ সালে শেখ সাদেক আলী এ মিষ্টি তৈরি করেন। তাঁর মৃত্যুর পর এখন ছেলে জাহাঙ্গীর আলম ও নুরুজ্জামান এ মিষ্টি তৈরি ও বিক্রি করছেন। এটি বাদামি রঙের, স্পঞ্জ ধরনের এবং হালকা মিঠা। দেশী গরুর দুধের ছানা ও উন্নতমানের চিনি এর উপাদান। মিষ্টি তৈরির জ্বালানি হিসেবে তেঁতুল কাঠ ব্যবহৃত হয়।
মুক্তাগাছার মণ্ডা : ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার মণ্ডার ঐতিহ্য প্রায় ২০০ বছরের। ১৮২৪ সালে প্রথম এ মিঠাই তৈরি করা হয়। এর পর থেকে এটি ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মণ্ডা প্রস্তুত হয় মূলত গরুর খাঁটি দুধের ছানা ও চিনির মিশ্রণ দিয়ে। দেখতে অনেকটা সন্দেশের মতো। ব্রিটিশ আমলে আটটি মণ্ডায় এক সের হয়ে যেত। এখন আকার ছোট হয়েছে। এক কেজিতে ২২টির মতো মণ্ডা থাকে।
মণ্ডা গোল চ্যাপ্টা আকৃতির মিষ্টান্ন। দেখতে অনেকটা প্যাড়ার মতো। কড়া পাকের সাধারণত চিনি মেশানো ক্ষীরের গরম নরম অবস্থায় গোল তাল পাকানো মণ্ডকে পরিষ্কার শক্ত কোনো তলের ওপর বিছানো কাপড়ের ওপর হাত দিয়ে ছুড়ে আছাড় মেরে চ্যাপ্টা করার কাজটি সম্পন্ন হয়। পরে ঠাণ্ডা হলে শক্ত হয়ে যায় এবং তখন কাপড় থেকে খুলে নেয়া হয়। তাই যেদিকটা নিচে (কাপড়ে লেগে) থাকে সেটা পুরো সমতল হয় আর অন্য দিকটা একটু উত্তল ও কিনারা ফাটা ফাটা হয়। ক্ষীরের রঙের ওপর নির্ভর করে মণ্ডা সাদা বা ঈষৎ হালকা খয়েরি রঙের হয়।
গুঠিয়ার সন্দেশ : বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কের উজিরপুর উপজেলার গুঠিয়ায় গাড়ি থামাতে না পারলে অনেকেরই মন খারাপ হয়। কারণ, এখানকার সন্দেশ। গুঠিয়ার সন্দেশ নামে এর পরিচিতি। গরুর দুধের খাঁটি ছানা, চিনি আর কিশমিশ দিয়ে তৈরি হয় এ সন্দেশ। এক পিস বিক্রি হয় ছয় টাকায়, কেজি ৩০০ টাকা।
কুমিল্লার রসমালাই : দুধ থেকে বিশেষভাবে তৈরি মালাই, চিনি আর ময়দা মিলিয়ে তৈরি হয় রসমালাই। আবহাওয়া, পরিবেশ আর ভালো কারিগরের কারণে কুমিল্লায় রসমালাই ভালো হয়। কেজিপ্রতি দাম ২০০ থেকে ২৫০ টাকা।
নাটোরের কাঁচাগোল্লা : সন্দেশ দুধের ছানা দিয়ে তৈরি এক ধরনের উপাদেয় মিষ্টান্ন। ছানার সাথে চিনি বা গুড় মিশিয়ে ছাঁচে ফেলে সন্দেশ প্রস্তুত করা হয়ে থাকে। খাদ্য উপাদানের দিক থেকে এটি একটি পুষ্টিকর খাবার। আমাদের উৎসব-আয়োজনে এই নকশাদার উপাদেয় খাবারটির ব্যবহার অনেক আগে থেকেই হয়ে আসছে। বিভিন্ন এলাকার মিষ্টি তৈরির কারিগরেরা এই সন্দেশ তৈরির ব্যাপারটাকে একটা শৈল্পিক ব্যাপারে পরিণত করে ফেলেছে। নাটোরের কাঁচাগোল্লা এই সন্দেশেরই একটি রূপ। নামে কাঁচাগোল্লা হলেও এটি কিন্তু গোল্লাজাতীয় নয়, আদতে দুধের ছানা থেকে তৈরি শুকনো মিষ্টি। কাঁচাগোল্লার জন্য প্রথমে দুধের ছানা তৈরি করে পানি নিংড়ে নিতে হয়। এরপর গরম চিনির শিরার সঙ্গে মিশিয়ে নাড়তে হয়। শুকিয়ে এলে তৈরি হয় কাঁচাগোল্লা।
আদি চমচম : জনশ্রুতি আছে ‘চমচম’ নামের উৎপত্তি চমৎকার থেকে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জের আদি চমচমের ইতিহাস বাংলার নবাবী আমলের। প্রাচীন বাংলার রাজধানী গৌড় তথা অবিভক্ত ভারতের মালদহ জেলার থানা ছিল শিবগঞ্জ। সে সময় এ অঞ্চলে ছিল অনেক ময়রার বসবাস। দেশ ভাগের পর অনেকে মালদহে চলে গেলেও বেশ কিছু পরিবার থেকে যায় শিবগঞ্জে। তারা এখনো পৈতৃক পেশা ধরে রেখেছেন।
উলিপুরের ক্ষীরমোহন : ২০ বছর আগে সিরাজগঞ্জ থেকে ভাগ্যের সন্ধানে উলিপুর আসেন হরিপদ ঘোষ। ‘পাবনা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’ নামে তিনি একটি মিষ্টির দোকান দেন। কারিগরও নিজেই। তাঁর মিষ্টিগুলো ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তবে বেশি জনপ্রিয়তা পায় ক্ষীরমোহন। গোল্লাটি তুলনামূলক বড় হয়, ঘন রসে ঢাকা থাকে।
পাতক্ষীর : পাতক্ষীর অন্যরকম মিষ্টি। স্বাদে, গন্ধে ও চেহারায় খুবই আলাদা। মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান বাজারের কাছে একমাত্র সন্তোষপাড়া গ্রামেই এটি তৈরি হয়। গরুর দুধ জ্বাল দিতে দিতে ঘন হয়ে এলে বিশেষ পাতিলে রাখা হয়। এতে সামান্য চিনি মেশানো হয়। ঠাণ্ডা হয়ে এলে কলা পাতায় মুড়িয়ে বিক্রি করা হয়। পাতায় মোড়ানো হয় বলে নাম হয়েছে পাতাক্ষীর, যা কালক্রমে হয়ে গেছে পাতক্ষীর। সন্তোষপাড়া গ্রামে এখন সাতটি পরিবার এটি তৈরি করে। একটি পরিবার দিনে ৫০টি ক্ষীর তৈরি করতে পারে।
ডোমারের সন্দেশ : দুধের ছানা, চিনি আর খেজুর গুড়ের মিশ্রণে বিশেষভাবে তৈরি হয় এ সন্দেশ। পাওয়া যায় নীলফামারীর ডোমার উপজেলায়। নীলফামারী ছাড়িয়ে এর খ্যাতি এখন সারা দেশে। আমেরিকা, সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুরসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে ডোমারের সন্দেশ। ডোমার উপজেলা সদরের আদি দাদাভাই হোটেল অ্যান্ড মিষ্টান্ন ভাণ্ডার এবং পলি মিষ্টান্ন ভাণ্ডার এর জন্য খ্যাত। প্রায় ৭০ বছর ধরে এ দু’টি প্রতিষ্ঠান সন্দেশ তৈরি করছে। দাম প্রতি কেজি ৩২০ টাকা।
চ্যাপ্টা রসগোল্লা : মহিষের খাঁটি দুধের ছানা দিয়ে তৈরি হয় চ্যাপ্টা আকারের রসগোল্লা। এটি ‘ম্যানেজারের চ্যাপা রসগোল্লা’ নামে পরিচিত। ৬৩ বছর ধরে এর সুনাম অক্ষুণœ। বাইরের কেউ এলে মৌলভীবাজারের মানুষ এ রসগোল্লা দিয়ে আপ্যায়ন করেন, ফিরে যাওয়ার সময়ও সঙ্গে এক প্যাকেট দিয়ে দেন। মহিষের দুধের ছানা বিশেষ পদ্ধতিতে কেটে এ রসগোল্লা তৈরি করতে হয়। ছানার সঙ্গে অন্য কিছুই মেশানো হয় না।
রাজশাহীর রসকদম : রাজশাহী শহরের প্রায় সব হোটেলেই রসকদম পাওয়া যায়। মিষ্টিটির বয়স প্রায় ৩২ বছর। রসকদম তৈরিতে লাগে দুধের মোয়া, ছানা, চিনি, চিনির গুলি, সাদা দানা। প্রথমে দুধের মোয়া, ছানা ও চিনি দিয়ে পাঁচ থেকে ১০ মিনিট জ্বাল দিতে হয়। গরম থাকা অবস্থায়ই আরো কয়েক মিনিট ভালোভাবে নাড়তে হয়। ঠাণ্ডা হলে ছোট ছোট গোল্লা তৈরি করা হয়। তারপর এগুলো সাদা মিষ্টি দানা দিয়ে মুড়ে দেয়া হয়। সব মিলিয়ে আধঘণ্টা সময় লাগে।
পোড়াবাড়ীর চমচম : ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকের কথা। টাঙ্গাইল শহর থেকে চার কিলোমিটার পশ্চিমে পোড়াবাড়ীতে ছিল লঞ্চঘাট। খরস্রোতা ধলেশ্বরীর পাশে ঢালান শিবপুর ঘাটে ভিড়ত স্টিমার, যাত্রীবাহী লঞ্চ আর মালবাহী বড় বড় জাহাজ। তখন পোড়াবাড়ী ছিল জমজমাট ব্যবসাকেন্দ্র। সে সময় আসাম থেকে দশরথ গৌড় নামে এক ঠাকুর পোড়াবাড়ীতে আসেন। তিনি ধলেশ¡রী নদীর মিষ্টি পানি আর এখানকার গরুর গাঢ় দুধ দিয়ে ‘চমচম’ নামের এ মিষ্টি তৈরি করেন। পোড়াবাড়ীর পানিতে রয়েছে এই মিষ্টি তৈরির মূল রহস্য।
বালিশ মিষ্টি : নেত্রকোনা জেলার একটি প্রসিদ্ধ মিষ্টি এটি। আকারে বালিশের মতো বড় না হলেও দেখতে অনেকটা বালিশের মতো এবং এর ওপরে ক্ষীরের প্রলেপ থাকাতে একটি কভারওয়ালা বালিশের মতো দেখতে হয়।
ছানামুখী : এটি বি-বাড়িয়া জেলায় পাওয়া যায়। মিষ্টিটি ছানার তৈরি চারকোনা ক্ষুদ্রাকার এবং শক্ত, এর ওপর জমাটবাঁধা চিনির প্রলেপযুক্ত থাকে। খেতে খুবই সুস্বাদু ও পুষ্টিকর।
কালোজাম : এটি বাংলাদেশের প্রায় সব জায়গাতেই তৈরি করা হয়। কালোজাম বা গুলাব জামুন দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপালের একটি জনপ্রিয় মিষ্টি খাদ্য। কালচে-লাল রঙের মিষ্টি; যা ময়দার গোলায় চিনি, ছানা ও মাওয়া মিশিয়ে ঘিয়ে ভেজে সিরায় জ্বাল দিয়ে বানানো হয়। এই মিষ্টি মূল প্রক্রিয়ায় রয়েছে তেলে ভাজা ও সিরাপের মাঝে ভিজিয়ে রাখা। কালোজাম তৈরির উপকরণের মাঝে রয়েছে গুঁড়ো দুধ, তরল দুধ, বেকিং পাউডার, মাওয়া, তেল, পানি, এলাচ গুঁড়ো, কেশার, চিনি। কালোজাম এসেছে একরকম আরবীয় মিষ্টি নাম ‘লৌকোমাদেস’ (খড়ঁশড়ঁসধফবং) থেকে। এই মিষ্টি মোগল আমলে খুব জনপ্রিয় ছিল। মাঝে মাঝে সিরাপ ব্যবহার করা হতো। এই মিষ্টির কদর সুদূর তুর্কি পর্যন্ত চলে গেছে।
প্রাণহারা : প্রাণহারা সন্দেশের গোলায় গোলাপ পানি মিশিয়ে মাওয়ার প্রলেপ দিয়ে তৈরি করা এক ধরনের মিষ্টি। এটি খেতে বেশ সুস্বাদু।
মকড়ম : ডিমের সাদা অংশকে ফেটিয়ে চিনি মিশিয়ে জমাট বাঁধিয়ে মকড়ম নামের মিষ্টি প্রস্তুত করা হয়। এই মিষ্টি মুখে দিলে গলে যায়। মিষ্টিটি পুষ্টিকর।

এছাড়া অন্যান্য বিখ্যাত মিষ্টির মধ্যে রয়েছে বিক্রমপুর ও কলাপাড়ার রসগোল্লা, যশোরের খেজুরগুড়ের সন্দেশ, খুলনা ও মুন্সীগঞ্জের আমৃতি, নওগাঁর প্যাড়া সন্দেশ, ময়মনসিংহের আমিরতি, যশোরের খেজুর রসের ভিজা পিঠা, মাদারীপুরের রসগোল্লা, রাজশাহীর তিলের খাজা, নওগাঁর রসমালাই, পাবনার প্যারাডাইসের প্যাড়া সন্দেশ ও পাবনার শ্যামলের দই, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের পানিতোয়া, কুষ্টিয়ার মহিষের দুধের দই, স্পেশাল চমচম ও তিলের খাজা, মেহেরপুরের সাবিত্রী মিষ্টান্ন, মানিকপুর-চকরিয়ার মহিষের দই, গাইবান্ধার রসমঞ্জুরি, ঢাকার পূর্ণিমার জিলাপি, রেশমি জিলাপি, কিশোরগঞ্জের তালরসের পিঠা ইত্যাদি।
মিষ্টি খেতে কমবেশি সবাই ভালোবাসে। আর এতক্ষণ মিষ্টি নিয়ে যে বিষয়গুলো উপস্থাপন করা হলো, আশা করি কোথাও বেড়াতে গেলে এখন থেকে এই মিষ্টিগুলো অবশ্যই খুঁজে নেবে এবং খেতে ভুলবে না।

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখক সম্পর্কে জানুন

এই রকম আরও সংবাদ

1 মন্তব্য

  1. Samantha

    V8w5bx9GwCdwzNC0XJ6DFP1Ky5sRdSEtRCiJ0VIP13KtoyeflIGYkiNr6pHl9ckho8bbI4MB9dAPK

    Hi, very nice website, cheers!
    ——————————————————
    Need cheap and reliable hosting? Our shared plans start at $10 for an year and VPS plans for $6/Mo.
    ——————————————————
    Check here: https://www.good-webhosting.com/

    V8w5bx9GwCdwzNC0XJ6DFP1Ky5sRdSEtRCiJ0VIP13KtoyeflIGYkiNr6pHl9ckho8bbI4MB9dAPK

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *