সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৯

জঙ্গিবাদ: কতটা ঝুঁকিতে বাংলাদেশ?

নিউজ ডেস্কঃ শ্রীলঙ্কায় ভয়াবহ জঙ্গি হামলার পর বাংলাদেশে জঙ্গিদের নতুন করে সংগঠিত হওয়ার বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। জঙ্গিদের একাধিক হুমকির পর প্রশ্ন উঠেছে, বর্তমানে বাংলাদেশ কতটা ঝুঁকিতে রয়েছে? জঙ্গিরা কি নতুন করে কোনও হামলার ছক কষছে? যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনও হুমকি নেই জানিয়ে সতর্ক থাকার কথা বলা হচ্ছে। তবে, এরইমধ্যে রাজধানীর ঢাকার মোহাম্মদপুরে র‌্যাবের অভিযানে দুই জঙ্গি নিহত হয়েছে। একই দিন সন্ধ্যায় গুলিস্তান পুলিশকে লক্ষ করে হাতবোমা হামলা করা হয়, যার দায় স্বীকার করেছে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএস। এছাড়া জঙ্গিদের প্রোপাগান্ডা চ্যানেলগুলো থেকেও হুমকি সংবলিত বিভিন্ন বার্তা প্রকাশ করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (৩০ এপ্রিল) ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া আহত পুলিশ সদস্যদের দেখতে গিয়ে বলেছেন, ‘বৈশ্বিক যে উগ্রবাদের প্রভাব আছে সারাবিশ্বে, বাংলাদেশও তার বাইরে নয়। দেশের মানুষকে রক্ষার জন্য, কোনও নৈরাজ্য উগ্রবাদ দমানোর জন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে জঙ্গিদের সংঘবদ্ধ বা বড় ধরনের নাশকতা করার ক্ষমতা নেই। ২০১৬ সালে হলি আর্টিজান হামলার পর তাদের বিধ্বস্ত করা হয়েছে। কখনও কখনও তারা বিচ্ছিন্নভাবে কিছু ঘটনা ঘটনোর অপচেষ্টা করছে, সেগুলো আমরা নজরদারিতে রাখছি।’

ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের কর্মকর্তারা বলছেন, মার্চে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে মসজিদের হামলার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য জঙ্গিদের মধ্যে কিছুটা তৎপরতা দেখা গেছে। গত মাসে শ্রীলঙ্কার জঙ্গি হামলার পর বাংলাদেশের জঙ্গিদের মধ্যে অনেক বেশি তৎপরতা দেখা গেছে। তারা নতুন করে কিছু হুমকি সংবলিত বিভিন্ন রকমের বার্তা পোস্ট করে জনমনে ভীতি সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে।

সম্প্রতি জঙ্গিদের প্রোপাগান্ডা চ্যানেল আল মুরসালাত মিডিয়া থেকে ‘শিগগিরই আসছে, ইনশাল্লাহ’ লেখা একটি পোস্টার নিয়ে হইচই শুরু হয়। তবে এটি জঙ্গিদের একটি ভিডিও ‘নাশীদ’ প্রকাশের পোস্টার ছিল বলে জানিয়েছেন নিয়মিত জঙ্গিবাদ পর্যবেক্ষণ করেন এমন ব্যক্তিরা। কিন্তু এই ঘটনার তিন দিনের মাথায়, ঢাকার গুলিস্থানে তিন পুলিশ সদস্যকে লক্ষ্য করে বোমা ছুঁড়ে পালিয়ে যায় মটরবাইকে থাকা অজ্ঞাত ব্যক্তিরা। পুলিশের বিশেষজ্ঞরা বোমাটিকে ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস বা আইইডি বলে মনে করছেন। সেদিন সকালেই ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকায় একটি ‘জঙ্গি আস্তানা’য় র‌্যাবের অভিযানের সময় দুই ‘জঙ্গি’ আত্মঘাতি হয় বলেও দাবি করা হয়েছে র‌্যাবের পক্ষ থেকে। পরবর্তীতে সেখান থেকে চারটি আইইডি নিস্ক্রিয় করা হয়। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই ধারণা করা হচ্ছে, জঙ্গিরা নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে, ছক কষছে হামলার।

পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, জঙ্গিদের প্রোপাগান্ডা চ্যানেলে গত কিছুদিন ধরেই তারা এমন কিছু উপকরণ পাচ্ছেন, যাতে মনে হচ্ছে জঙ্গিরা আবার হামলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমনকি দুনিয়াজুড়ে যে ‘লোন উলফ’ বা লিডারলেস জিহাদের আহ্বান করা হচ্ছে, সে সম্পর্কিত একটি অনলাইন ম্যাগাজিনও প্রকাশ করেছে, যাতে কৌশল ও টার্গেট উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে গত কয়েকদিনে হুমকি সংবলিত কয়েকটি বার্তাকেও তারা একেবারে উড়িয়ে দিতে চাইছেন না। এজন্য রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসহ ভিন্নভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয়ের সামনেও পুলিশ মোতায়েন করা রয়েছে।

এদিকে বুধবার (১ মে) রাতে আল মুরসালাত মিডিয়া থেকে বাংলা, ইংরেজি ও হিন্দি ভাষায় একটি বার্তা প্রকাশ করা হয় আবু মুহাম্মদ আল বাঙ্গালী নামে, যাকে ‘বাংলার খালিফা’ বা আমীর ঘোষণা করা হয়েছে কয়েক মাস আগেই। ওই বার্তায় বাংলাদেশ ও ভারতের ‘তাগুত’ (জঙ্গিদের ভাষায় পুলিশ) বাহিনীর ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দেয়া হয়।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, আবু মুহাম্মদ আল বাঙ্গালীর নাম তারা এর আগেও শুনেছেন। তবে তার সম্পর্কে বিস্তারিত কোনও তথ্য তাদের কাছে নেই। আর যেভাবে একের পর এক হুমকির কথা বলা হচ্ছে, সেরকম শক্তি বা সামর্থ্য এখন বাংলাদেশের কোনও জঙ্গি সংগঠনের নেই। এমনকি হামলার জন্য যেসব রসদ বা বিস্ফোরক প্রয়োজন সেসব সংগ্রহ করাও কঠিন।

তবে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের অপর একজন কর্মকর্তা বলেছেন, ‘ডন’ নামে একটি ক্যারেকটারের বিষয়ে তাদের কাছে কিছু তথ্য রয়েছে, যাকে তারা আবু মুহাম্মদ আল বাঙ্গালী মনে করছেন। তাদের কাছে তথ্য রয়েছে, এই ডনই নব্য জেএমবি বা আইএসপন্থী জঙ্গিদের সংগঠিত করার চেষ্টা করছে।

জঙ্গি প্রতিরোধ নিয়ে কাজ করে আসা কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে সক্রিয় থাকা নব্য জেএমবির কার্যক্রম ২০১৬ সালের পর থেকে কোনঠাসা অবস্থায় রয়েছে। তাদের শীর্ষ প্রায় সব নেতাই হয় কারাবন্দি বা বিভিন্ন অভিযানে নিহত হয়েছেন। নতুন করে এই সংগঠনের দায়িত্ব কেউ নিয়েছে বলে কোনও তথ্য নেই। অপরদিকে আনসার আল ইসলাম বা আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের শীর্ষ একজন নেতা সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত মেজর জিয়াউল হক এখনও পলাতক রয়েছেন। তবে তাদের সহযোগী অনেক মধ্যমসারির নেতাকর্মীকে গ্রেফতারের পর কারাগারে পাঠানো হয়েছে। যারা ভারতে গিয়ে আত্মগোপন করেছিল, ভারতীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও তাদের অনেককেই গ্রেফতার করেছে।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, জঙ্গিদের এসব হুমকিকে অনেক বেশি গুরুত্ব না দিলেও একেবারে উড়িয়ে দেয়াও হচ্ছে না। সতর্কতার সঙ্গে আগে থেকেই যে কোনও পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকেও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার জন্য নানারকম কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমোডোর ইশফাক ইলাহী চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক একটা শক্তি আছে, যারা মাঝে মধ্যেই সক্রিয় হয়ে উঠতে চায়। ভারতের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান হচ্ছে। পাকিস্তানের মাসুদ আজহারকে জাতিসংঘ থেকে ইন্টারন্যাশনাল টেরোরিস্ট ঘোষণা করা হয়েছে। শ্রীলঙ্কায় একটা বড় ঘটনা ঘটলো। আমরা তো একই বলয়ের ভেতরে। আর বাংলাদেশে এ ধরণের সন্ত্রাসী বা জঙ্গি কর্মকাণ্ড তো নতুন নয়, প্রায় দুই-তিন দশক ধরে হচ্ছে। ঢাকার বছিলায় সেদিন অপারেশন হলো, গুলিস্থানের ঘটনায় ব্যবহৃত বোমাটি আইইডি। এসব ঘটনা ইঙ্গিত দেয়, তারা (জঙ্গিরা) চেষ্টা করছে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করার।’

তিনি আরও বলেন, ‘নিরাপত্তা বাহিনীর একার পক্ষে তো সব কিছু করা সম্ভব না। এজন্য আমাদের সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। গুলশান-বারিধারায় বা ডিপ্লোম্যাটিক জোনে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু তারা তো সফট টার্গেট চুজ করে। হার্ড জায়গা তারা চুজ করবে না। যেখানে সিকিউরিটি নাই, সেখানে কোনও কিছু হলে তো ক্যাজুয়ালিটি অনেক বেশি হবে। এজন্য অস্বাভাবিক কিছু দেখলেই ৯৯৯-এ কল করা উচিত। পরিবারের কারও মধ্যে পরিবর্তন দেখলেও কাউন্সেলিং করা উচিত। পুলিশকে জানানো উচিত। এছাড়া বর্ডারগুলোতে নজরদারি বাড়াতে হবে। কারণ বাইরে থেকে কেউ আসলে তো বৈধভাবে আসবে না বা পাসপোর্ট নিয়ে আসবে না। মোটকথা, আমাদের কোনও হুমকি উড়িয়ে না দিয়ে সতর্ক থাকতে হবে।’

সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখক সম্পর্কে জানুন

এই রকম আরও সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *