সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৯

গরমে আইসক্রিম

মেহজাবীন তুলিঃ আইসক্রিম শব্দ হিসেবে খুব বড় নয়; কিন্তু নিশ্চিত করে বলা যায়, আমাদের প্রত্যেকের জীবনে আইসক্রিম নিয়ে অনেক সুন্দর স্মৃতি আছে। অন্য সময় চটপটি, ঝালমুড়ি চললেও গরমের এই সময় ছেলেবেলায় স্কুল শেষে কে লাল-কমলা আইসক্রিমের কাঠির জন্য বায়না ধরেনি? ভ্যানগাড়ি থেকে কোন আইসক্রিম চেখে বাড়ি ফিরতে ফিরতে কতবার হাতেই গলে গেছে সে আইসক্রিমের বরফ! মাথায় ফেরি করা লাল লাল, বড় মটকা থেকে কুঁচি করা মালাই আইসক্রিম খেতে খেতে কত ছেলেমেয়েই তো ভেবেছে- ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কোন ছার, বড় হয়ে আইসক্রিমওয়ালাই হবো!

দুপুরবেলা আইসক্রিমওয়ালার ঘণ্টা ধ্বনি আর আইসক্রিম বলে চিৎকারে দৌড়ে যায়নি- এমন শিশু কি খুঁজে পাওয়া যাবে? এক টাকা দুই টাকা করে জমিয়ে একটি আইসক্রিম কিনে খেতে খেতে বাড়ি ফেরার গল্প রয়েছে সবারই। হাজারো খাবারের ভিড়ে আইসক্রিম নিজের জায়গা তৈরি করে রেখেছে আলাদা করে। এর তুলনা খুঁজে পাওয়া যায় না।

এখন বাংলাদেশে হরেক স্বাদ আর ব্র্যান্ডের আইসক্রিম পাওয়া যায়। প্রত্যেক অবস্থাপন্ন বাড়িতে রেফ্রিজারেটর রয়েছে। তবুও শিশু থেকে বৃদ্ধ কারও কাছেই আইসক্রিমের আবেদন কমেনি এতটুকু। ঠাণ্ডা-কাশিজনিত বা গান গাওয়া আর গলা বসে যাওয়ার চিন্তায় অনেককেই আইসক্রিমের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হতে দেখা যায়; কিন্তু এমন বোধহয় সত্যিই খুঁজে পাওয়া যাবে না, যার কাছে আইসক্রিম ভালো লাগে না। বরং বিভিন্ন উদযাপন বা বিয়ের অনুষ্ঠানগুলোতে ডেজার্ট হিসেবে আইসক্রিমের ব্যবহার বেড়েছে।

আইসক্রিম আবিস্কারের সঠিক দিনক্ষণ ও আবিস্কারকের নাম রয়ে গেছে আজও অজানা। উইকিপিডিয়া জানাচ্ছে, আইসক্রিমের জন্ম চীনে। ইতালীয় পর্যটক মার্কোপোলো আইসক্রিম তৈরির কৌশলটি চীন থেকে ইউরোপে নিয়ে আসেন। খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে রোমান সম্রাট নিরোর অনুচররা অ্যাপেনাইন পর্বত থেকে বরফ সংগ্রহ করে তার সঙ্গে মধু, বাদাম, ফলের রস মিশিয়ে একে সুস্বাদু মিষ্টান্নে পরিণত করে। আমরা এখন যেসব আইসক্রিম খাই তার প্রচলন আঠারো শতক থেকে। নিউইয়র্কে ১৭৭৬ সালে প্রথম আইসক্রিম পার্লার চালু হয়। ফিলাডেলফিয়ার ন্যান্সি জনসন নামে এক নারী প্রথম আইসক্রিম তৈরির যন্ত্র আবিস্কার করেন। আবার বাচ্চাদের জন্য ললিপপ রাখবেন, নাকি আইসক্রিম- এ দুইয়ের মাঝে নির্ণয় করতে না পেরে বিক্রেতা ক্রিশ্চিয়ান নেলসন হালের কাঠিওয়ালা ললি আইসক্রিম তৈরি করেন।

সমগ্র পৃথিবীতে আইসক্রিমের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। এমনকি এ যুদ্ধে সমাপ্তি অনুষ্ঠান উদযাপিত হয় আইসক্রিম খাওয়ার মধ্য দিয়ে। আইসক্রিমের জনপ্রিয়তা এতই বাড়ে যে, ১৯৮৪ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিগান জুলাই মাসকে ‘ন্যাশনাল আইসক্রিম মান্থ’ হিসেবে ঘোষণা করেন।

আমাদের দেশে আইসক্রিম প্রথম উৎপাদন শুরু হয় চট্টগ্রামে, ১৯৬৪ সালে। এখন দেশি-বিদেশি মিলিয়ে বাজারে প্রচলিত আইসক্রিমের ব্র্যান্ডের সংখ্যা অর্ধডজন ছাড়িয়েছে। আইসক্রিম তৈরির প্রধান উপাদান বিভিন্ন দুগ্ধজাত দ্রব্য, যেমন- কনডেন্সড মিল্ক্ক, ক্রিম, বাটার ফ্যাট, ভেজিটেবল ফ্যাট, স্ট্যাবিলাইজার প্রভৃতি। আরও থাকে বিভিন্ন ফ্লেভার, বাদাম, শুকনো নারিকেলের নির্যাস। এসব কাঁচামালের অধিকাংশই আমদানি করতে হয় ভারত, চীন, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, নিউজিল্যান্ড, ডেনমার্ক প্রভৃতি দেশ থেকে। আইসক্রিম স্কুপার তৈরিতে অ্যালুমিনিয়াম, স্টেইনলেস স্টিল ইত্যাদি ব্যবহূত হয়। আইসক্রিমের মোড়ক আনা হয় থাইল্যান্ড, কোরিয়া, তুরস্ক থেকে।

গুগল ঘেঁটে জানা যায়, পৃথিবীজুড়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় আইসক্রিমের ফ্লেভার হলো ভ্যানিলা। আমাদের দেশেও ভ্যানিলা ফ্লেভারের জনপ্রিয়তা রয়েছে। এ ছাড়া ম্যাংগো, স্ট্রবেরি, চকোলেট ফ্লেভারের পাশাপাশি আমাদের দেশীয় ক্ষীর, ফিরনি, পায়েসের ফ্লেভারেও এখন বাজারে আইসক্রিম মেলে। তাছাড়া গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকটি দেশি-বিদেশি আইসক্রিম পার্লার যাত্রা শুরু করেছে এ দেশে। সাধ্যে কুলালে কখনও ঢুঁ মেরে আসতে পারেন আইসক্রিম পার্লার থেকে। পিস্টাচিও, বাটার স্কচ, ব্ল্যাক ফরেস্ট, রাস্পিবেরি প্রভৃতি ফ্লেভারও মন ভোলাবে। আইসক্রিম পার্লারগুলোতে নানা ধরনের টপিং ব্যবহারে স্বাদ বৃদ্ধি করা হয়। মেন্যুর বাইরে আইসক্রিমপ্রিয় ক্রেতারা তাদের পছন্দমতো টপিং এবং সিরাপ নিয়ে নিতে পারেন আইসক্রিমে। জানা যায়, গোটা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ব্যবহূত আইসক্রিম টপিং হলো চকোলেট সিরাপ।

আইসক্রিম খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বকুনি ফ্রি পাওয়া যেত ছোটবেলায়। তবে আইসক্রিমে রয়েছে বেশ কিছু পুষ্টিগুণ। প্রথমত, আইসক্রিম একটি দুগ্ধজাত খাদ্য। ক্রিম তৈরি করা হয় দুধ দিয়ে। আর দুধ মানেই তাতে রয়েছে ক্যালসিয়াম। আর ক্যালসিয়াম হাড় ও দাঁতের জন্য প্রয়োজনীয়। আইসক্রিম দেয় ইনস্ট্যান্ট এনার্জি। ক্লান্ত শরীরে আইসক্রিম খেলে চাঙ্গা লাগবে, কারণ এতে রয়েছে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন এবং ফ্যাট। এ ছাড়া আইসক্রিমে রয়েছে বেশ কিছু ভিটামিন। যেমন- ভিটামিন এ, ডি, কে, বি-৬, বি-১২ এবং ভিটামিন ই ছাড়াও আইসক্রিমে থাকে নিয়াসিন, থায়ামিন এবং রাইবোফ্ল্যাভিন ভিটামিন। ঠাণ্ডা কোনো কিছু খাওয়ার পর শরীর অতিরিক্ত ক্যালরি বার্ন করে, যাতে দেহের তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকে। আর ক্যালরি বার্ন করা মানেই ওজন কমানোর প্রাথমিক ধাপ। তাই পরিমিত পরিমাণ আইসক্রিম নিয়মিত খেলে তা ওজন কমাতে সাহায্য করবে।

আইসক্রিম খেলে মস্তিস্ক সেরোটোনিন এবং ডোপামাইন হরমোন নিঃসরণ করে। এই দুটি হরমোনই মুড ভালো থাকার প্রধান কারণ। তবে প্রচুর আইসক্রিম একসঙ্গে খাবেন না। স্মরণ করিয়ে দিই, শুধু সাধারণ এক কাপ ভ্যানিলা আইসক্রিমেই ২৭৩ ক্যালরির মতো আছে। ফলে গরমে অতিরিক্ত আইসক্রিম খেয়ে ডায়েট ও স্বাস্থ্যের বারোটা যেন না বাজে সেদিকে খেয়াল রাখতে ভুলবেন না।

একটি গবেষণা থেকে জানা যায়, জুন মাসে সব থেকে বেশি আইসক্রিম তৈরি হয়। এর মানে এ সময়ে আইসক্রিমের চাহিদাও থাকে সবচেয়ে বেশি। আমাদের দেশে অবশ্য গরম মানেই আইসক্রিমের প্রতি হাত বাড়িয়ে দেওয়া। চৈত্র মাস থেকে বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ তাপমাত্রা থাকে উঠতির দিকে। এ সময়ে আইসক্রিম মানেই এক রাশ স্বস্তি। তাই আইসক্রিম দেখলেই মুখে ভুবন ভোলানো হাসি ছড়িয়ে যায়।

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখক সম্পর্কে জানুন

এই রকম আরও সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *