সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৯

শত বছরের ইতিহাসেও শতভাগ ভোটের নজির নেই: সুজন

নিজস্ব প্রতিবেদক: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের ১০৩টি আসনের ২১৩টি ভোট কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়া ও ৭৫টি নির্বাচনী এলাকায় ৫৮৭টি কেন্দ্রে একটি মাত্র প্রতীকে ভোট পড়া অস্বাভাবিক এবং অবিশ্বাস্য বলে তথ্য তুলে ধরেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)।

শতবছের ইতিহাসেও শতভাগ ভোটের এমন নজির নেই বলে দাবি সুজনের। রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করে এই অসামঞ্জস্য তথ্যের তদন্ত পূর্বক দায়িদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি তোলা হয়েছে।

মঙ্গলবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এমন তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দুটি আসন ব্যতীত একটানা চারটি নির্বাচনে জয়ী আসনসমূহে ধানের শীষের প্রার্থী অস্বাভাবিক হারে কম ভোট পেয়েছেন। আবার মহাজোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ভোটের ব্যবধানও অস্বাভাবিক। এমনটি ইভিএম ও ব্যালট পেপার ভোটের মধ্যে অনেক পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। ৩০০ আসনের মধ্যে ইভিএম পদ্ধতিতে ছয়টি নির্বাচনী এলাকায় ভোট হয়। তুলনা করলে দেখা যায়, ৩০০ আসনে গড়ে ৮০ দশমিক ২০ শতাংশ ভোট পড়লেও ইভিএমে ভোট পড়ার গড় ৫১.৪২ শতাংশ।

দেখা যায়, রংপুর-৩ আসনে দি মিলেনিয়াম স্টারস স্কুল এন্ড কলেজ ভোটকেন্দ্রে ইভিএমে সবচেয়ে কম ১ দশমিক ৮৭ শতাংশ ভোট পড়েছে। ইভিএমে এতো কম ভোট কেনো, সে বিষয়ে যৌক্তিক ব্যাখ্যা থাকা উচিত ছিলো নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে। এটা কি ব্যালট বাক্সে আগের রাতে ভর্তি করতে না পারার কারণে এমন হয়েছে- প্রশ্ন সুজনের।

সংগঠনের দাবি, পৃথিবীতে নির্বাচনের শত বছরের ইতিহাসেও কোনো কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়ার নজির দেখা যায়নি। কেননা, তালিকাভুক্ত ভোটারের মৃত্যুবরণ, অসুস্থ থাকা, জরুরি কাজে বাইরে থাকা ইত্যাদি খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। তাই ২১৩টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়া যেকোনো যুক্তিতেই স্বাভাবিক নয়।

ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৭৫টি আসনের ৫৮৭টি কেন্দ্রের সকল বৈধ ভোট মাত্র একজন প্রার্থী পেয়েছেন। অন্য কোনো প্রার্থী এক ভোটও পাননি। ওই কেন্দ্রগুলোর একটি বাদে সকল ভোট পেয়েছে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী। আর একটা কেন্দ্রের ভোট পেয়েছে ধানের শীষের প্রার্থী। আবার ৭৫ আসনের মধ্যে ৭৪টি আসনের ভোট পেয়েছে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা। একটিতে পেয়েছে ওয়ার্কাস পার্টির প্রার্থী।

আরেক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গোপালগঞ্জ জেলার তিনটি আসনের ৩৮৭টি কেন্দ্রের মধ্যে ২৩৯টিতেই প্রদত্ত শতভাগ ভোট পড়েছে নৌকা প্রতীকে। গোপালগঞ্জ-৩ আসনের ১০৭টি কেন্দ্রের ৭৭টিতেই নৌকায় শতভাগ ভোট পড়েছে।

সুজনের সেক্রেটারি বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন বলছে শতভাগ ভোট পড়ার দায়িত্বটা আমাদের না। আমাদের কথা হলো তাহলে দায়িত্বটা কার। কমিশন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী এ নির্বাচনে চরম অসামঞ্জস্যতা পরিলক্ষিত হয়েছে। তাই আমি দাবি করি অভিভাবক হিসেবে রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করে ফলাফলের এ অস্বাভাকিতা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিক।

বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, কারচুপি ছাড়া এমন অসামঞ্জস্য ফল সম্ভব না। পাগল ছাড়া কেউ এ নির্বাচনকে সুষ্ঠু মনে করবেন না। এ নির্বাচনের অসংগতিপূর্ণ তথ্যকে আমলে নিয়ে রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৯৬ (২) অনুচ্ছেদ অনুসারে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করে দায়ীদের অপসারণ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া যায় কি না, কাউন্সিল ক্ষতিয়ে দেখবেন। এ তথ্য বিদেশী কোনো সংস্থা, টিআইবি বা কোনা রাজনৈতিক দলের নয়। এর উৎস হলো খোদ নির্বাচন কমিশন।

বিশিষ্ট কলামিস্ট আবুল মকসুদ বলেন, ‘অতীতেও অস্বচ্ছ নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু এ নির্বাচন কমিশন গোজামিলে না গিয়ে ‘সোজামিল’অর্থাৎ শতভাগ ভোটে চলে গেছে, যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। এমন নির্বাচনের জন্য বর্তমান কমিশনকে রোজ হাশরের দিনে হলেও জবাবদিহি করতে হবে।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিচার হওয়ার আগে আর কোনো নির্বাচন যেনো এ কমিশন করতে না পারে এ দাবি পেশ করছি। তাদের নিজেদের দেওয়া তথ্যই তাদের শেষ করেছে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি হাফিজ উদ্দিন খান। লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার।

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখক সম্পর্কে জানুন

এই রকম আরও সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *