1. [email protected] : admin :
  2. [email protected] : News Editor : News Editor
বৃহস্পতিবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ০৩:৪৬ অপরাহ্ন

মুঘল আমলে ঈদ উদযাপন কেমন ছিল

সাংবাদিক
  • আপডেট সময় : সোমবার, ৩১ মার্চ, ২০২৫
  • ৪ বার সংবাদ দেখেছেন

ডেক্স/// মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উদযাপন ঈদুল ফিতর। এক মাস সিয়াম সাধনার পর এদিন একসঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠে মুসলিম সম্প্রদায়। মুঘল সাম্রাজ্যের বিলাসবহুল দরবারে এই দিনটি বিশেষ স্থান দখল করেছিল। ঈদুল ফিতর ছিল মুঘল দরবারের মধ্যে জাঁকজমকপূর্ণ, ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যমূলক এবং সম্মিলিতভাবে উদযাপন করা একটি উৎসব। মুঘল ইতিহাসে ঈদুল ফিতরের গতিপথ অভিন্ন ছিল না, কারণ এটি মুঘল শক্তির বিবর্তিত ধারণা এবং বিভিন্ন সম্রাটদের দ্বারা অনুসৃত বিভিন্ন নীতির প্রতিফলন ছিল। বিভিন্ন মুঘল সম্রাটদের শাসনামলে এই উদযাপনটি বিভিন্ন রূপ নিয়েছিল, যা প্রতিটি শাসকের ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যকে প্রতিফলিত করে। এমনকি এই বৈচিত্র্য সত্ত্বেও, ঈদুল ফিতর মুঘল রাজবংশের শেষ অবধি একটি উল্লেখযোগ্য উদযাপন ছিল।

পানিপথের প্রথম যুদ্ধে ইবরাহিম লোদির বিরুদ্ধে বাবরের জয়ের মাধ্যমে মুঘল সাম্রাজ্যের সূচনা হয়। মুঘল সম্রাটরা ছিলেন মধ্য এশিয়ার তুর্কো-মঙ্গোল বংশোদ্ভূত। তারা চাঘতাই খান ও তৈমুরের মাধ্যমে চেঙ্গিস খানের বংশধর। ১৫৫৬ সালে আকবরের ক্ষমতা গ্রহণের মাধ্যমে মুঘল সাম্রাজ্যের ধ্রূপদী যুগ শুরু হয়।

ইতিহাস ঘেটে দেখা গেছে, উজবেকরা সমরকন্দ থেকে বিতাড়িত হওয়ার পরে সম্রাট বাবর তার রাজ্যকে দাঁড় করানোর জন্য নিরলস সংগ্রামের মুখোমুখি হন। তার জীবনের বেশিরভাগ সময় তিনি যুদ্ধ ও সংঘর্ষে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন, জাঁকজমকপূর্ণ উদযাপনের জন্য বা তার উত্তরসূরিরা পরে যে আনুষ্ঠানিকতা অবলম্বন করবে তার জন্য খুব কম সুযোগ রেখেছিলেন সম্রাট আকবর। বিচার ব্যবস্থা এবং উদযাপনকে এড়িয়ে সম্রাট বাবরের প্রধান জোর ছিল সামরিক বিজয়ের ওপর, অর্থাৎ যুদ্ধ জয়।


মুঘল আমলের চিত্রকর্ম

বাবর নিজেই তার স্মৃতিকথা ‘বাবরনামা’য় সেই আমলে রমজান উদযাপনের চমকপ্রদ বিবরণ দিয়েছেন। তার স্মৃতিকথা সম্বলিত বইটি লেখা হয়েছিল ‘চাগতাই’ ভাষায়, যা এক সময় মধ্য এশিয়াজুড়ে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। পরবর্তী সময়ে সেই বই বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করে প্রকাশ করা হয়।

সম্রাট বাবর তার বইয়ে উল্লেখ করেন, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি সামরিক বিবেচনায় প্রতি বছর বিভিন্ন স্থানে ঈদের মতো গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানটি উদযাপনের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে বেছে নেন। ১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দে পানিপথের যুদ্ধের পর উত্তর ভারতে বাবর তাদের রাজকীয় মর্যাদার সঙ্গে মানানসই পদ্ধতিতে রমজান ও ঈদুল ফিতর পালন শুরু করেন।

ওই সময় ভারতের উত্তর প্রদেশের আগ্রার সিক্রি বিজয় উদ্যানের উত্তর-পূর্ব দিকে একটি পাথরের প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে ভোজের তাঁবুগুলো সুন্দরভাবে সাজানো হয়। তা সত্ত্বেও সম্রাট বাবর পরপর দুই বছর একই স্থানে পবিত্র রমজান মাস পালন না করার রীতি বজায় রাখেন। ১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি আগ্রায় উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেন এবং ১৫২৭ খ্রিষ্টাব্দে সিক্রিকে বেছে নেন। তার উত্তরসূরি সম্রাট হুমায়ুনও শের শাহ সুরির কাছে পরাজিত হওয়ার পর সাফাভিদ ইরানে নির্বাসিত হলে একই পরিণতির মুখোমুখি হন।

খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতাব্দীর শেষার্ধে সম্রাট আকবরের শাসনামলে মুঘল সাম্রাজ্য একীভুতকরণের অভিজ্ঞতা অর্জন করে। এই সময়েই নতুন আদালতের মাধ্যমে শিষ্টাচার ও ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এই পরিবর্তনগুলো ঈদুল ফিতরসহ রাজকীয় অনুষ্ঠান এবং উত্সবগুলোর সময় পালিত বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান এবং রীতিনীতির আনুষ্ঠানিকতার পথ প্রশস্ত করে।

সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালের একটি ঐতিহাসিক দলিল ‘তুজুক-ই-জাহিনগিরিতে’ রমজান এবং ঈদুল ফিতর উদযাপনের একটি বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায়। এই সময়ের মধ্যে সম্রাট আকবর দ্বারা প্রতিষ্ঠিত অনেক আনুষ্ঠানিক শিষ্টাচার এবং অনুশীলন মুঘল ঐতিহ্যের একটি স্থায়ী অংশ হয়ে ওঠে। ‘তুজুক-ই-জাহিনগিরিতে’ সম্রাট জাহাঙ্গীর রমজান মাসে তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। তিনি বর্ণনা করেন, কীভাবে তিনি নিজ সিংহাসন ছেড়ে ঈদগাহে যাত্রা করেন, যেখানে উৎসুক জনতার সঙ্গে তিনি দেখা করেন। তারা সম্রাটের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং তিনি তাদের উপহার দেন।


মুঘল আমলের চিত্রকর্ম
সম্রাট শাহজাহানের শাসনামলে ঈদুল ফিতর উদযাপন করা হতো অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে। ১৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট শাহজাহানের শাসনামলে মুঘল সভাসদ হামিদউদ্দিন লাহোরি রমজান ও ঈদুল ফিতরের ঘটনার বিবরণ দেন। তিনি উল্লেখ করেন, রমজানের সময় সদর মুসাভি খান সুবিধাবঞ্চিতদের স্বাগত জানান এবং ৩০ হাজার মূল্যের অর্থ অনুদান ও নিয়মিত ভাতাসহ ত্রাণ দেন। ১৬২৮ সালের ৩ জুন শাওয়াল মাসের নতুন চাঁদ নিয়ে আসে আনন্দ ও সংগীত। পরের দিন অর্থাৎ ঈদের দিন, রাজকুমার, অভিজাত লোকেরা, সভাসদ এবং রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তারা সম্রাটকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানাতে গ্র্যান্ড অডিয়েন্স হলে জড়ো হন। তিনি ঈদগাহে রাজকীয় প্রক্রিয়া চলাকালীন সময়ে আনুষ্ঠানিক শোভাযাত্রায় অংশ নেন, মোনাজাত করেন এবং সেখানে আগত জনতার মধ্যে স্বর্ণ বিতরণ করেন।

শাহজাহানের আরেক সভাসদ মুন্সী চন্দ্র ভান ব্রাহ্মণ ঈদগাহের বিশাল রাজকীয় শোভাযাত্রার স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, এটি একটি দুর্দান্ত দর্শনীয় স্থান ছিল, যেখানে সম্রাট জনসাধারণের দুআ কামনার জন্য প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে আসেন। সেখানকার ঘরবাড়ি এবং বাজারগুলো প্রাণবন্ত ব্রোকেড (রেশম সুতার তৈরি অত্যন্ত দামী কাপড়) দিয়ে সজ্জিত ছিল। আশেপাশের শহর ও গ্রাম থেকে অসংখ্য ব্যক্তি তাদের শাসককে এক ঝলক দেখার প্রত্যাশায় রাজধানীতে ভিড় করে। শোভাযাত্রা চলার রাজকীয় পথ এবং আশেপাশের মাঠগুলো নিখুঁতভাবে সাজানো এবং ম্যাচলক, রকেট ম্যান এবং পতাকা দিয়ে সজ্জিত অশ্বারোহী ও পদাতিক সৈন্যদের রেজিমেন্টসহ সুন্দরভাবে ডিজাইন করা হয়। পাশাপাশি ট্রাম্পেট, বিউগল এবং ক্ল্যারিয়নের দুর্দান্ত সুরে চারপাশের বাতাস পরিপূর্ণ ছিল। সম্রাট চমৎকারভাবে সজ্জিত ঘোড়ায় বা একটি রাজকীয় হাতির ওপরে বসে ঈদগাহের দিকে যাত্রা করেন। জমকালো শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে আয়োজনটি ছিল একইসঙ্গে জমজমাট ও উৎসবমুখর। রাজকীয় এই প্রক্রিয়া চলাকালীন সময়ে সাধারণ জনগণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে স্বর্ণ বিতরণ করা হয়। সম্রাট তখন ঈদগাহের দিকে যাত্রা করেন, সেখান গিয়ে তিনি নামাজ আদায় করেন। খুতবা শেষ হয়ে গেলে সব মৃত সম্রাটদের নাম নেওয়া হয়। যখন ক্ষমতাসীন রাজার নাম ঘোষণার সময় আসে, তখন ইমামকে একটি পোশাক দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় ওয়ারড্রোব সুপারিনটেনডেন্টকে এবং আর্থিক পুরস্কারও দেওয়া হয়।

সম্রাট শাহজাহান জামে মসজিদের নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর ১৬৫৬ সালের জুলাই মাসে ঈদুল ফিতরের দিন পরিদর্শন করেন। এ উপলক্ষে দুর্গের অভ্যন্তরে নাক্কার খানার সামনে থেকে মসজিদ পর্যন্ত পুরো পথটি ‘স্বর্ণ ও রূপাসহ দুই সারি হাতি দ্বারা সজ্জিত ছিল, পাশাপাশি প্রচুর মাস্কেটিয়ার্স, ম্যাচলক এবং রকেটম্যান’ উপস্থিত ছিল।

ইতিহাসের পাতায় আরও লেখা হয়েছে, শাহজাহানের মৃত্যু এবং তার পুত্র আওরঙ্গজেব ক্ষমতা গ্রহণের পর, ঈদুল ফিতর পালনের পদ্ধতিতে মৌলিক পরিবর্তন ঘটে। তিনি পাহাড়গঞ্জে একটি পৃথক ঈদগাহ নির্মাণ করেন এবং তার পিতা সম্রাট শাহজাহানের নির্মিত জামে মসজিদের পরিবর্তে সেখানে নামাজ আদায় করেন। তবে ধারণা করা হয়, ১৭০৭ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর এই কৃচ্ছ্রসাধন দ্রুত তুলে নেওয়া হয়, তার উত্তরসূরিরা সীমিত উপায় ও কর্তৃত্বের সঙ্গে জাঁকজমকপূর্ণভাবে ঈদুল ফিতর উদযাপন করা চালিয়ে যান।

ইতিহাসের বইগুলো থেকে মুঘল আমলে রমজান ও ঈদ উদযাপনের আরও তথ্য পাওয়া যায়। সেখান থেকে জানা গেছে, রমজান মাসের শেষ জুমার নামাজের পর বাদশা নামাজ শেষ করে আসর ই শরীফে (একটি ছোট বেষ্টনী যেখানে মহানবীর স্মৃতি রাখা আছে) যেতেন। তিনি সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং কিলায় ফিরে আসতেন।

রমজানের উনত্রিশতম দিনে চাঁদ দেখার জন্য দূত পাঠানো হতো। সবাই তখন অধীর আগ্রহে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে চাঁদ দেখার জন্য। কেউ যদি চাঁদ দেখে কিংবা কোনও বার্তাবাহক কোনও গ্রাম থেকে কোনও পর্যবেক্ষণের স্বাক্ষরিত চিঠি নিয়ে আসতো, তাহলে শুরু হতো উদযাপনের সময়। চাঁদ দেখার পর নাক্কারখানায় (ড্রাম হাউস) পরের দিন ঈদের আগমন উপলক্ষে ২৫টি বন্দুকের স্যালুট দেওয়া হতো। সেদিন চাঁদ দেখা না গেলে রমজানের ত্রিশতম দিনে দেওয়া হতো গান-স্যালুট।

ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায়ের জন্য বন্দুক, শামিয়ানা ও কার্পেট রাতে ঈদগাহে পাঠানো হতো। হাতিগুলোর গায়ে নকশা করা এবং সাজিয়ে প্রস্তুত করা হতো। ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাদশা স্নান করে রত্নখচিত পোশাক পড়তেন। সকালে নাস্তার টেবিল দ্রুত সেমাই এবং দুধ মিষ্টি মিছরি, শুকনো ফল, সাধারণ চাল দিয়ে সাজানো হতো। বাদশা নাস্তা করে প্রাসাদের বাইরে গেলে তখন একটি শিঙ্গা বাজানো হতো এবং শোভাযাত্রা শুরু করার প্রস্তুতি নেওয়া হতো।

সামাজিক যোগাযোগ এ শেয়ার করুন

একই বিভাগের আরও সংবাদ
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত © ২০২১ বাংলার মুখ বিডি
ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট @ ইজি আইটি সল্যুশন